আমার ছাত্রবন্ধু মোস্তফা সেলিম


নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : জুলাই ৫, ২০২১, ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন /
আমার ছাত্রবন্ধু মোস্তফা সেলিম

আমার শিক্ষকতা জীবনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী। চার দশকের বেশি সময়ের ব্যবধানে কেউ বিস্মৃত হয়নি আমাকে। এদের কেউ দেশে, কেউ বিদেশে। আমার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অন্যতম কৃতী ছাত্র মোস্তফা সেলিম। চার দশক ধরেই তিনি ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ককে লালন করে চলেছেন। ১৯৮০ সালে আমি মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার শাহবাজপুর হাইস্কুলে শিক্ষকতা শুরু করার পরের বছর ১৯৮১ সাল, এই বছরে মোস্তফা সেলিমের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে সাক্ষাৎ। তাঁর বাড়ি পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের ইটাউরি গ্রামে। ১৯৮১ থেকে ২০২১-চার দশকের নানা মাত্রার, গভীরতার সম্পর্ক।

মোস্তফা সেলিম পেশায় প্রকাশক, এখানে যেমন তাঁর সোনাঝরা সাফল্য আছে, সেটা ছাপিয়ে তিনি লেখক এবং গবেষক হিসেবেও বিপুলভাবে সমাদৃত।  দেশের বাইরে কলকাতা থেকেও তাঁর বই প্রকাশিত হয়েছে। সেলিমের লেখালেখির বিষয় শেকড়া¤্রয়ী। তিনি বাংলাদেশের এক বিলুপ্তগৌরব পুনরুদ্ধার করেছেন তাঁর গবেষণায়, অন্বেষণে।

মোস্তফা সেলিম পড়ালেখায় ছিলেন মেধাবী। তিনি ১৯৮৬ সালে শাহবাজপুর হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাশ করেছেন। ছোটোবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি সুকুমার বৃত্তির প্রতি তাঁর ছিল অনুরাগ। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফলাফল প্রত্যাশার অবসরে তিনি সাহিত্যপত্রিকা উদ্দাম সম্পাদনা করেন ১৯৮৮ সালে। ১৯৯০ সালে তিনি মদনমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্রসংসদের সাহিত্য ও বিতর্ক সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। কলেজ ছাত্রাবাসের ছাত্রাধিনায়ক পদেও তিনি নির্বাচিত হন। এসময় তিনি কলেজের প্রকাশনা ঈষিকা এবং ছাত্রাবাসের বার্ষিকী সংযোজন সম্পাদনা করেন। একই সময়ে তিনি অনির্বাণ নামেও আরেকটি সাহিত্যকাগজ সম্পাদনা করেছেন। মদনমোহন কলেজে অধ্যয়নকালীন তিনি দৈনিক সিলেটের ডাক এর ক্যাম্পাস প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতায় যোগ দেন। এ-সময়ে তিনি দৈনিক সিলেট বাণী এবং সাপ্তাহিক যুগভেরীতে নিয়মিত লিখেছেন। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও পরে প্রকাশনাশিল্পে প্রবেশ করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান উৎস প্রকাশন খুব দ্রুত সময়ে সর্ববাংলাদেশ পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করে, মূল স্রোতধারার অংশ হয়ে যায়। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, ভ্রমণকাহিনি, অর্থনীতি, দর্শন, গবেষণাসহ নানা বিষয়ে গ্রন্থ প্রকাশ করলেও একসময়ে তাঁর সিগনেচার আইডেন্টিটি ছিল সিলেট অঞ্চলের নামিদামি লেখকদের বিশেষ করে প্রয়াতদের মাস্টারপিসগুলো প্রকাশ করা। অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল তা সুনাম ও গৌরবের সঙ্গে অব্যাহত আছে। অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি ছিলেন সিলেটের একজন ইতিহাসবিদ ও বৈষ্ণব সাহিত্যের খ্যাতনামা পণ্ডিত, তিনি সিলেটের ইতিহাস রচনার জন্য বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর এই বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত-পূর্বাংশ ও শ্রীহট্টের ইতিবৃত্তÑউত্তরাংশ নামে দুটি খ-ে প্রকাশিত হয়েছিল। গ্রন্থটি আজও সিলেট ও প্রাচীন সিলেট অঞ্চলের (ভারতের করিমগঞ্জ অবধি বিস্তৃত) ইতিহাসচর্চায় ইতিহাসবিদগণ আকরগ্রন্থ হিসেবে মনে করেন ও ব্যবহার করে থাকেন। এ গ্রন্থটি দুষ্প্রাপ্য হয়ে গিয়েছিল। এ-গ্রন্থের চাহিদা সিলেট, ভারতের করিমগঞ্জ, কাছাড়, ত্রিপুরা ছাড়িয়ে কলকাতা পর্যন্ত ছিল। এই গ্রন্থের পুনঃপ্রকাশ মোস্তফা সেলিমকে প্রকাশকের চেয়েও বেশি পরিচিতি দিয়েছিল, দিয়েছিল সম্মান। সাহিত্যাঙ্গন ও সৃজনশীল পাঠাঙ্গনে প্রতীয়মান হয় যে এই নতুন প্রকাশক বণিক গোত্রের নন, তিনি ইতিহাস-ঐতিহ্য প্রভাবিত পাঠবান্ধব এক প্রকাশক। রাতারাতি পাঠক, বোদ্ধা, গবেষক, প-িতমহলে সাড়া পড়ে। তিনি সংশ্লিষ্ট সকলের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। বৃহৎ কলেবরের এই আকর গ্রন্থটি পুনঃপ্রকাশ করতে আর্থিকসহ নানা ঝুঁকি নিতে হয়েছে তাঁকে। তবে জ্ঞানবাণী আবারও প্রমাণিত হয়, ‘ভাগ্য সাহসীদের প্রতি সুপ্রসন্ন’। এ ধরনের আরও অনেক গ্রন্থ তিনি প্রকাশ করেছেন। এর বাইরেও মোস্তফা সেলিমের বিশেষ পরিচিতি আছে।

লুপ্ত বর্ণমালা সিলেটি নাগরীলিপি ও সাহিত্য গবেষণা, প্রকাশনা এবং তার নবজাগরণে অনন্য ভূমিকা রেখে তিনি দেশ-বিদেশে নন্দিত। সেলিমের সাফল্যই এখানে, তিনি প্রায় একাই সিলেটি নাগরীলিপি ও তার সাহিত্যকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। এটি যে কত বড়ো একটি কাজ, ভবিষ্যতই তাকে সেই স্বীকৃতি দেবে। উৎস প্রকাশন ২০০৭ সালে লাভ করে বাংলা একাডেমি অ্যাওয়ার্ড। এটা তাঁর নিরন্তর কর্মযজ্ঞের এক অনন্য মূল্যায়ন।

২০০৭ সালে তিনি মাসিক ভ্রমণচিত্র সম্পাদনা শুরু করেন। পত্রিকাটির সম্পাদক এবং প্রকাশক তিনি। অল্প সময়ে কাগজটি পাঠকনন্দিত হয়। এই সূত্রে তিনি অসাধারণ দুটো বই উপহার দিয়েছেন পাঠককে, এর একটি হচ্ছে বাংলাদেশ ভ্রমণঙ্গী এবং অপরটি ভারত নেপাল ভুটান ভ্রমণসঙ্গী।

মোস্তফা সেলিম নাগরীলিপি নবজাগরণের লক্ষে কাজ শুরু করেন একদশক আগে। এ বিষয়ে তাঁর সম্পাদনা এবং মৌলিক গ্রন্থ সংখ্যা ৩৩। এই কাজের মধ্য দিয়ে সেলিম যেমন পেয়েছেন স্বীকৃতি, তেমনি ঝুটেছে খ্যাতি। এছাড়া তাঁর সংগ্রহে নাগরীলিপিতে রচিত অনেক পুথির পা-ুলিপিও রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা-প্রকল্পেও কাজ করেছেন। তাঁর কর্ম এবং পরিচিতির ব্যাপকতায় আমি তাঁর শিক্ষক হিসেবে অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত বোধ করি। ছাত্রাবস্থায় তাঁর মধ্যে সৃষ্টিশীল প্রতিভার ছাপ ছিল। আরও দশজন ছাত্রের সঙ্গে অনেক বিষয়ে মিলের পরও কী যেন একটা বিষয় তাঁকে আলাদা করে রাখত। এখন সেটা দৃশ্যমান হচ্ছে, পরিস্ফুট হচ্ছে তার প্রতিভার দ্যুাতি।

সিলেট অঞ্চলে প্রচলিত প্রায় ছয়শ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী নাগরীলিপি নিয়ে গবেষণা করছেন মোস্তফা সেলিম। লুপ্তপ্রায় বর্ণমালা সিলেটি নাগরীলিপি ও সাহিত্য গবেষণা, প্রকাশনা এবং তার নবজাগরণে তাঁর ভূমিকা যে কত বিশাল, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে, শ্রম দিয়ে, সময় দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।  সৈয়দ শাহনূর, ভেলা শাহ ফকির, মমিনউদ্দিন দৈখুরাসহ খ্যাতিমান বহু গীতিকবি এবং পুথিকার এই লিপিতে তাঁদের সাহিত্যচর্চা করেছেন। পৃথিবীর বহু ভাষার যেখানে নিজের বর্ণমালাই নেই, সেখানে এক ভাষার একাধিক লিপি থাকার গৌবর কেবল বাংলাভাষারই আছে। কীভাবে নাগরীলিপির উদ্ভব ও প্রচলন হয় এ সম্পর্কে গবেষকদের মধ্যে রয়েছে নানা মত। বাংলাপিডিয়াতে নাগরীলিপি সম্পর্কে মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘সিলেটি নাগরী বাংলালিপির বিকল্প একপ্রকার লিপি, একসময় প্রধানত সিলেট অঞ্চলে এটি প্রচলিত ছিল। তবে সিলেটের বাইরে কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা এবং অসমের কাছাড় ও করিমগঞ্জেও এর ব্যবহার ছিল। আরবি, কাইথি, বাংলা ও দেবনাগরী লিপির সংমিশ্রণে চতুর্দশ শতকের প্রথম দশকে এ লিপির উদ্ভব ঘটে। আরবি ও ফারসি ভাষার সঙ্গে সিলেটের স্থানীয় ভাষার সংমিশ্রণে যে মুসলমানি বাংলা ভাষার প্রচলন হয়, তার বাহক হিসেবে সিলেটি নাগরী ব্যবহৃত হত। সিলেটের তৎকালীন মুসলমান লেখকগণ বাংলার পরিবর্তে এই লিপিতেই ধর্মীয় বিষয়সমূহ চর্চায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। হজরত শাহজালাল (র.) সমসাময়িক মুসলমান ধর্মপ্রচারকগণ এই লিপিতে ধর্মমত লিপিবদ্ধ করতেন বলে জানা যায়।’ লেখক বদরুল হায়দারও সিলেটি নাগরীলিপির অনুরূপ মূল্যায়ন করেছেন, ‘সিলেটি নাগরীলিপির উদ্ভব আরবি, কাইথি, বাংলা ও দেবনাগরীর অনুসরণে চতুর্দশ শতকে। এ লিপিতে রচিত হয়েছে শত শত গ্রন্থ, দলিলদস্তাবেজ এবং পরিচালিত হয়েছে সেকালের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কার্যক্রম। নাগরীলিপির সাহিত্য ধারণ করেছে সিলেটি উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা। নাগরী সাহিত্যে মূলত ইসলামি নানা কাহিনি বিধৃত হয়েছে। মানবিক প্রেম-প্রণয় উপাখ্যানও প্রাধান্য পেয়েছে। এ ছাড়া নবিচরিত, ধর্মের বাণী, রূপকথা, সামাজিক রচনা, সুফিবাদ, ফকিরি গান, বীরগাথা এবং মরমি কাহিনিমূলক পুঁথি রচিত হয়েছে। প্রায় ছয়শ’ বছর বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষত সিলেট অঞ্চলে প্রচলিত ছিল এ লিপির সাহিত্য। সিলেট ছাড়াও কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, ভৈরব, করিমগঞ্জ, শিলচর ও আসামে এর ব্যবহার ছিল।’

নাগরী পুথি-পুস্তক বর্তমানে দুষ্প্র্রাপ্য। প্রায় ৫০ বছর পূর্বে এসব অমূল্য গ্রন্থ কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে। এটি এখন বিস্মৃত ঐতিহ্যের নাম। বাংলা ভাষার এ গৌরবগাথা এখন বিলুপ্তপ্রায়। এই হিরণ¥য় অধ্যায় পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে প্রকাশিত হয় বিলুপ্ত নাগরীলিপির পঁচিশটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের ‘নাগরী গ্রন্থসম্ভার’। মোস্তফা সেলিম ইতোমধ্যে নাগরীলিপির পঁচিশটি পুথি সম্পাদনা (যৌথভাবে) করে ব্যাপক খ্যাতি পেয়েছেন। এই সিরিজে নাগরীলিপি ও সাহিত্য সম্পর্কে বিস্তারিত ভূমিকা উপস্থাপন করা হয়েছে। মূলপাঠে নাগরীলিপির পাশাপাশি বাংলা লিপ্যন্তর সংযোজন করা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রন্থের পরিশেষে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক শব্দাবলির অর্থ এবং পাশাপাশি নাগরীলিপি ও বাংলা বর্ণমালার বর্ণচিত্র। নাগরীলিপির গ্রন্থসম্ভার বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বর্ণাঢ্য স্মারক। ‘নাগরী গ্রন্থসম্ভার’ নাগরীলিপি ও সাহিত্য সম্পর্কে জানার জন্য পাঠককে সুযোগ করে দেবে। বই প্রকাশ করে পাঠককে আন্দোলিত করতে সক্ষম না হলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সার্থকতা কোথায়? সিলেটি নাগরীলিপির প্রচার ও প্রসারে তিনি অনেক কিছুই করছেন। ২০১৮ সালে সিলেটি নাগরীলিপি বই উৎসব আয়োজন করেন মোস্তফা সেলিম, তাঁর প্রতিষ্ঠান উৎস প্রকাশনের এই আয়োজন ছিল সিলেটি নাগরীলিপি ফিরে পাওয়ার আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ষেলকলায পূর্ণ। সিলেট নগরীর রিকাবিবাজারসংলগ্ন কবি নজরুল অডিটোরিয়ামে উৎসবটি আয়োজনে কিছু সংস্থা পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল। তার মানে নাগরীলিপি নিয়ে করপোরেট সংস্থাগুলোও আগ্রহ দেখাচ্ছে। বই উৎসবে আলোচনা সভা, তথ্যচিত্র প্রদর্শনী, পুথিপাঠ, সংগীতানুষ্ঠান ও মঞ্চ নাটক উপস্থাপনের পাশাপাশি গুণিজনকে দেওয়া হয় আজীবন সম্মাননা। অসাধারণ ছিল সে আয়োজন।

কলাম বিভাগের আরো খবর

আরও খবর